আরহেনিয়াসের আয়নীয় তত্ত্ব অনুযায়ী অ্যাসিডের সংজ্ঞা (Acid):
যে সমস্ত যৌগ জলীয় দ্রবণে আয়নিত হয়ে বা বিয়োজিত হয়ে শুধু মাত্র ক্যাটায়ন রূপে এক বা একাধিক H+ আয়ন উৎপন্ন করে, তাদের অ্যাসিড বলে। এই H+ আয়ন খুব অস্থায়ী। তাই একটি H+ আয়ন আবার একটি জলের অণুর (H2O) সঙ্গে যুক্ত হয়ে হাইড্রোক্সোনিয়াম আয়ন উৎপন্ন করে। তাই বলা যায়, যে সমস্ত যৌগ জলীয় দ্রবণে আয়নিত বা বিয়োজিত হয়ে ক্যাটায়ন রূপে হাইড্রক্সোনিয়াম (H3O+) আয়ন উৎপন্ন করে, তাদের অ্যাসিড বলে।
যেমন,
HCl→←\vboxto.5ex\vssH++Cl−
H++H2O=H3O+
H2SO4→←\vboxto.5ex\vss2H++SO4=
2H++2H2O=2H3O+
HNO3→←\vboxto.5ex\vssH++NO3−
H++H2O=H3O+
H2CO3→←\vboxto.5ex\vss2H++CO3=
2H++2H2O=2H3O+
CH3COOH→←\vboxto.5ex\vssH++CH3COO−
H++H2O=H3O+
অ্যাসিডের সাধারণ বৈশিষ্ট্য:
1. অ্যাসিড মাত্রই জলীয় দ্রবণে আয়নিত হয়ে বা বিয়োজিত হয়ে কেবলমাত্র এক বা একাধিক ক্যাটায়ন রূপে H+ আয়ন উৎপন্ন করে যা পরে জলের একটি অণুর সাথে যুক্ত হয়ে হাইড্রক্সোনিয়াম (H3O+) আয়ন উৎপন্ন করে। যেমন,
HCl→←\vboxto.5ex\vssH++Cl−
H++H2O=H3O+
H2SO4→←\vboxto.5ex\vss2H++SO4=
2H++2H2O=2H3O+
HNO3→←\vboxto.5ex\vssH++NO3−
H++H2O=H3O+
H2CO3→←\vboxto.5ex\vss2H++CO3=
2H++2H2O=2H3O+
CH3COOH→←\vboxto.5ex\vssH++CH3COO−
H++H2O=H3O+
2. অ্যাসিড সাধারণত জলে দ্রবণীয় এবং জলীয় দ্রবণে অম্ল বা টক স্বাদযুক্ত
3. অ্যাসিডের জলীয় দ্রবণ নীল লিটমাসকে লাল করে এবং মিথাইল অরেঞ্জের কমলা বর্ণকে লাল বর্ণে পরিণত করে।
4. হাইড্রোজেনের চেয়ে বেশি তড়িৎধনাত্বক ধাতু যেমন, জিঙ্ক (Zn), ম্যাগনেশিয়াম (Mg), আয়রণ (Fe) ইত্যাদি ধাতুর সঙ্গে অ্যাসিডের প্রতিস্থাপন বিক্রিয়ার মাধ্যমে হাইড্রোজেন গ্যাস (H2↑) নির্গত করে। যেমন,
Zn+2HCl=ZnCl2+H2↑
Zn+H2SO4=ZnSO4+H2↑
Fe+2HCl=FeCl2+H2↑
Mg+2HNO3=Mg(NO3)2+H2↑
5. অ্যাসিড ধাতব অক্সাইড বা হাইড্রক্সাইডের (ক্ষার) সঙ্গে বিক্রিয়া করে লবণ ও জল উৎপন্ন করে। যেমন,
NaOH+HCl=NaCl+H2O
NaOH+H2SO4=Na2SO4+H2O
CaO+2HCl=CaCl2+H2O
MgO+H2SO4=MgSO4+H2O
6. অ্যাসিড ধাতব কার্বনেট বা বাইকার্বনেট লবনের সঙ্গে বিক্রিয়া করে কার্বন ডাইঅক্সাইড গ্যাস উৎপন্ন করে। যেমন,
Na2CO3+2HCl=2NaCl+CO2↑+H2O
NaHCO3+HCl=NaCl+CO2↑+H2O
অ্যাসিডের সনাক্তকরণ
1. অ্যাসিডে নীল লিটমাস পেপার লাল হয়ে যায় এবং মিথাইল অরেঞ্জের কমলা বর্ণ লাল হয়ে যায়।
2. কার্বনেট বা বাইকার্বনেট লবণে কয়েক ফোঁটা অ্যাসিড যোগ করলেই বুদবুদ সৃষ্টি করে কার্বন ডাইঅক্সাইড (CO2↑) গ্যাস নির্গত করে যা স্বচ্ছ চুনজলকে ঘোলা করে দেয়।
3. লঘু যেকোনো অ্যাসিডের সঙ্গে ম্যাগনেশিয়াম বা জিঙ্ক ধাতু যোগ করলে বর্ণহীন, গন্ধহীন হাইড্রোজেন গ্যাস (H2↑) উৎপন্ন করে যার মধ্যে জ্বলন্ত পাটকাঠি প্রবেশ করালে, পাটকাঠিটি নিভে যায় কিন্তু গ্যাসটি নীল শিখায় জ্বলে।
এই প্রমাণগুলির দ্বারা বোঝা যায় যৌগটি একটি অ্যাসিড।
ক্ষারক (Bases):
যে সমস্ত ধাতব অক্সাইড বা হাইড্রক্সাইড অ্যাসিডের সঙ্গে বিক্রিয়া করে লবন ও জল উৎপন্ন করে, তাদের ক্ষারক বলে।
যেমন, ক্যালশিয়াম অক্সাইড (CaO), ম্যাগনেশিয়াম অক্সাইড (MgO), সোডিয়াম মনোক্সাইড (Na2O), সোডিয়াম হাইড্রক্সাইড (NaOH), ক্যালশিয়াম হাইড্রক্সাইড (Ca(OH)2), অ্যালুমিনিয়াম হাইড্রক্সাইড (Al(OH)3) ইত্যাদি।
CaO+2HCl=CaCl2+H2O
NaOH+HCl=NaCl+H2O
MgO+2HCl=MgCl2+H2O
CuO+2HNO3=Cu(NO3)2+H2O
Al(OH)3+3HCl=2AlCl3+3H2O
ক্ষারকের কিছু ব্যতিক্রম:
1. অধিকাংশ ধাতব অক্সাইড বা হাইড্রক্সাইড ক্ষারক হলেও, কিছু কিছু ধাতুর অক্সাইড ক্সারক নয়। যেমন, ম্যাঙ্গানিজের অক্সাইডগুলি হল MnO, Mn2O3, Mn3O4। এদের মধ্যে MnO এবং Mn2O3 ক্ষারক হলেও Mn3O4 ক্ষারক নয়।
2. আবার কিছু কিছু যৌগ আছে যারা ধাতব অক্সাইড বা ধাতব হাইড্রক্সাইড নয়। কিন্তু তাদের মধ্যে ক্ষারকধর্ম বর্তমান। যেমন, সোডিয়াম কার্বনেট (Na2CO3), সোডিয়াম বাইকার্বনেট (NaHCO3) যৌগদুটি আসলে লবন। তবুও এরা অ্যাসিডের সাথে বিক্রিয়া করে লবন, জল ও কার্বন ডাইঅক্সাইড (CO2↑) গ্যাস উৎপন্ন করে।
3. অ্যামোনিয়া (NH3) ধাতব অক্সাইড বা ধাতব হাইড্রক্সাইড নয়। অ্যামোনিয়া (NH3) অ্যাসিডের সঙ্গে বিক্রিয়া করে লবন ও জলও উৎপন্ন করে না। কিন্তু জলীয় দ্রবণে অ্যামোনিয়া, অ্যামোনিয়াম হাইড্রক্সাইড (NH4OH) উৎপন্ন করে যা আয়নে বিয়োজিত হয়ে অ্যানায়নরূপে OH− আয়ন দেয়। সেইজন্য অ্যামোনিয়াকে (NH3) ক্ষারক বলা হয়।
NH3+HCl=NH4Cl
NH3+H2O=NH4OH
4. কিছু কিছু জৈব যৌগ আছে, যাদের মধ্যে ক্ষারকের ধর্ম বর্তমান। অথচ এরা ধাতব অক্সাইড বা হাইড্রক্সাইড নয়। যেমন, মিথাইল অ্যামিন (CH3NH2), অ্যানিলিন (C6H5NH2) ইত্যাদি।
ক্ষার (Alkali):
যেসমস্ত ক্ষারকধর্মী ধাতব অক্সাইড বা ধাতব হাইড্রক্সাইড জলে দ্রাব্য, তাদের ক্ষার (Alkali) বলে:
যেমন, ক্যালশিয়াম অক্সাইড (CaO), ম্যাগনেশিয়াম অক্সাইড (MgO), সোডিয়াম মনোক্সাইড (Na2O), সোডিয়াম হাইড্রক্সাইড (NaOH), পটাশিয়াম হাইড্রক্সাইড (KOH), ক্যালশিয়াম হাইড্রক্সাইড (Ca(OH)2) ইত্যাদি ধাতব অক্সাইড বা ধাতব হাইড্রক্সাইড গুলি জলে দ্রাব্য। তাই এরা ক্ষার (Alkali)। আবার ক্ষারকও বটে। কিন্তু
অ্যালুমিনিয়াম হাইড্রক্সাইড (Al(OH)3), জিঙ্ক হাইড্রক্সাইড (Zn(OH)2), ফেরিক হাইড্রক্সাইড (Fe(OH)3), জিঙ্ক অক্সাইড (ZnO), ফেরিক অক্সাইড (FeO) এরা জলে দ্রবীভূত হতে পারে না। তাই এরা ক্ষারক হলেও ক্ষার নয়।
আরহেনিয়াসের আয়নীয়তত্ত্ব অনুযায়ী ক্ষারের সংজ্ঞা:
যে সমস্ত যৌগ জলীয় দ্রবণে আয়নিত হয়ে বা বিয়োজিত হয়ে অ্যানায়ন রূপে কেবলমাত্র হাইড্রক্সিল আয়ন OH− উৎপন্ন করে, তাদের ক্ষার (Alkali) বলে।
যেমন,
CaO+H2O=Ca(OH)2, Ca(OH)2→←\vboxto.5ex\vssCa+++2OH−
MgO+H2O=Mg(OH)2, Mg(OH)2→←\vboxto.5ex\vssMg+++2OH−
Na2O+H2O=2NaOH, NaOH→←\vboxto.5ex\vssNa++OH−
NaOH→←\vboxto.5ex\vssNa++OH−
KOH→←\vboxto.5ex\vssK++OH−
ক্ষারের সাধারণ বৈশিষ্ট্য:
1. ক্ষারমাত্রই জলীয় দ্রবণে আয়নিত হয়ে বা বিয়োজিত হয়ে অ্যানায়ন রূপে কেবলমাত্র হাইড্রক্সিল (OH−) উৎপন্ন করে।
যেমন,
CaO+H2O=Ca(OH)2, Ca(OH)2→←\vboxto.5ex\vssCa+++2OH−
MgO+H2O=Mg(OH)2, Mg(OH)2→←\vboxto.5ex\vssMg+++2OH−
Na2O+H2O=2NaOH, NaOH→←\vboxto.5ex\vssNa++OH−
NaOH→←\vboxto.5ex\vssNa++OH−
KOH→←\vboxto.5ex\vssK++OH−
2. ক্ষার জলে দ্রবনীয় এবং জলীয় দ্রবণে পিচ্ছিল হয়।
3. ক্ষারের জলীয় দ্রবণ লাল লিটমাসকে নীল করে।
4. ক্ষার, অ্যাসিডের সঙ্গে বিক্রিয়া করে লবণ ও জল উৎপন্ন করে। যেমন,
HCl+NaOH=NaCl+H2O
MgO+2HCl=MgCl2+H2O
Ca(OH)2+2HCl=CaCl2+2H2O
Fe(OH)3+3HCl=FeCl3+3H2O
5. ক্ষার, ধাতব লবনের সঙ্গে বিক্রিয়া করে, ধাতুটির হাইড্রক্সাইড যৌগ উৎপন্ন করে। যেমন,
CuCl2+2NaOH=2NaCl+Cu(OH)2
ক্ষারের সনাক্তকরণ:
1. ক্ষারের জলীয় দ্রবণে দু-তিন ফোঁটা লাল লিটমাস দ্রবণ যোগ করলে, দ্রবণটি নীল বর্ণের হয়ে যায়।
2. ক্ষারের দ্রবণে দু-তিন ফোঁটা ফেনলপথ্যালিন যোগ করলে, দ্রবণের বর্ণ গোলাপী হয়ে যায়।
এই প্রমানগুলি দ্বারা বোঝা যায়, যৌগটি একটি ক্ষার।
জল ভিন্ন অপর কোনো দ্রাবকে অ্যাসিড ও ক্ষার সংক্রান্ত বিষয়ে আরহেনিয়াসের আয়নীয় তত্ত্বের সীমাবদ্ধতা:
অ্যাসিড ও ক্ষার বিষয়ে আরহেনিয়াসের আয়নীয় তত্ত্বের সীমাবদ্ধতা:
পদার্থের জলীয় দ্রবণ ছাড়া আরহেনিয়াসের অ্যাসিড-ক্ষার সংক্রান্ত আয়নীয়তত্ত্ব প্রযোজ্য হয় না:
1. আরহেনিয়াসের আয়নীয় তত্ত্ব অনুযায়ী অ্যাসিড এবং ক্ষারগুলিকে সনাক্ত করতে তাদের জলীয় মাধ্যমের প্রয়োজন। জলীয় মাধ্যম ছাড়া অ্যাসিড ও ক্ষারের ধর্ম ব্যাখ্যা করা যায় না।
2. জল ভিন্ন অন্য কোনো অজলীয় দ্রাবকে যৌগের অ্যাসিড বা ক্ষার ধর্ম এই তত্ত্বের সাহায্যে ব্যাখ্যা করা যায় না। যেমন,
(i) তরল অ্যামোনিয়া দ্রাবকে দ্রবীভূত অ্যামোনিয়াম ক্লোরাইড (NH4Cl) অ্যাসিডের ন্যায় আচরণ করে।
(ii) তরল অ্যামোনিয়া দ্রাবকে দ্রবীভূত সোডামাইড (NaNH2) ক্ষারের ন্যায় আচরণ করে।
3. হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড (HCl), নাইট্রিক অ্যাসিড (HNO3) ইত্যাদি জলীয় দ্রবণে ক্যাটায়ন রূপে কেবলমাত্র H+ আয়ন দেয়। কিন্তু জল ভিন্ন অপর দ্রাবকে এই অ্যাসিডগুলি H+ আয়ন দেয় না। যেমন, তরল অ্যামোনিয়াতে, হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিড (), NH4+ আয়ন দেয়।
NH3(l)+HCl=NH4Cl
NH4Cl→←\vboxto.5ex\vssNH4++Cl−
তাই বলা যায়, অ্যাসিড-ক্ষার সংক্রান্ত আরহেনিয়াসের আয়নীয় তত্ত্বটি কেবলমাত্র ওই পদার্থগুলির জলীয় দ্রবণের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয়। জল ছাড়া অন্য কোনো দ্রাবকে এই আরহেনিয়াসের আয়নীয় তত্ত্বটি প্রায় প্রযোজ্য হয় না।
লবণ (Salt):
লবণ (Salt): অ্যাসিডের প্রতিস্থাপনযোগ্য হাইড্রোজেন পরমাণু, ধাতু বা ধাতুধর্মী মূলক দ্বারা আংশিক বা সম্পূর্ণরূপে প্রতিস্থাপিত হয়ে যে যৌগ উৎপন্ন করে, তাদের লবণ বলে।
No comments:
Post a Comment